দেশে চিকিৎসা ব্যয় মেটানোর কারণে প্রতিবছর জনসংখ্যার ৩ শতাংশের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায়। সংখ্যায় তা অন্তত ৬২ লাখ। মানুষের পকেট থেকে চলে যাচ্ছে মোট স্বাস্থ্যব্যয়ের ৭৩ শতাংশ অর্থ। আর এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খরচ হয় ওষুধের পেছনে এবং তারপর বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষার পেছনে। রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষার ফি সরকারি হাসপাতালে কম হলেও বেসরকারি পর্যায়ে তা কয়েকগুণ বেশি। বিভিন্ন সময়ে পরীক্ষার ফি নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হলেও তা কখনই আলোর মুখ দেখেনি। তাই জনমনে প্রশ্ন এসব পরীক্ষার ফি কমবে কবে?
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালে চিকিৎসার পেছনে মানুষের পকেট থেকে চলে যেতো ৫৫ দশমিক ৯ শতাংশ অর্থ। সেটি বেড়ে ২০২০ সালে হয়েছে ৬৮ শতাংশ, সর্বশেষ ২০২১ সালের হিসাবে সেটি আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩ শতাংশে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তি পর্যায়ে ব্যয় সবচেয়ে বেশি আফগানিস্তানে ৭৭ দশমিক ২০ শতাংশ। এরপরই রয়েছে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৩ শতাংশ। এছাড়া পাকিন্তানে ৫৭ দশমিক ৫০ শতাংশ, নেপালে ৫১ দশমিক ৩০, ভারতে ৪৯ দশমিক ৮০, শ্রীলঙ্কায় ৪৩ দশমিক ৬০, ভুটানে ১৮ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং সবচেয়ে কম খরচ হয় মালদ্বীপে ১৪ দশমিক ৩০ শতাংশ অর্থ।
রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিভিন্ন হাসপাতালে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষার ফি এক রকম নয়। রাজধানী এবং রাজধানীর বাইরের এলাকা ভেদে এই মূল্যের তারতম্য দেখা যায়। কোথাও কোথাও একই পরীক্ষার মূল্য ১০০ টাকা থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত পার্থক্য দেখা যায়। তাই রোগীদের দাবি, এসব মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া হোক।
রাজধানীর বাসিন্দা ফারুক আহমেদ কয়েকদিন ধরে ঠান্ডা জ্বরে ভোগেন। সেজন্য চিকিৎসকের পরামর্শে বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষা করানোর প্রয়োজন হয়। তার মতে, ঢাকার একেক হাসপাতালে পরীক্ষার মূল্য একেক রকম। কোথাও কম আবার কোথাও বেশি। নির্ভর করে কে কত খরচ করতে পারে, তার ওপরে।
তার মতে, যার কাছে বেশি টাকা আছে সে যাবে দামি হাসপাতালে। আবার যার কম সে মধ্যম মানের, কিংবা সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা করাতে যায়। তবে মধ্যম মানের হাসপাতালেও যে বিভিন্ন টেস্টের দাম কম তা কিন্তু নয়। এটা নিয়ন্ত্রণ করা উচিত সরকারের।
২০২১ সালের ৩ জানুয়ারি করোনা ভাইরাসের চিকিৎসার ব্যয় সাধারণের নাগালে রাখার লক্ষ্যে অতি জরুরি ও প্রয়োজনীয় ১০টি পরীক্ষার মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগোনস্টিক সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) পরীক্ষাগুলোর নতুন মূল্য নির্ধারণ করে দেন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের এ সম্পর্কিত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের ডেঙ্গু রোগীর মতো কিছু সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন হয়। সেগুলোর সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণের জন্য অধিদফতর থেকে বেসরকারি হাসপাতাল/ক্লিনিক মালিক ও ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এছাড়া কিছু করপোরেট হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গেও আলোচনা হয়। সেই আলোচনার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রস্তাবিত খসড়া মূল্য চূড়ান্ত করা হলো। এখন থেকে এ নির্ধারিত মূল্য সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য হিসাবে গণ্য হবে।
স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, যেসব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কম মূল্যে পরীক্ষা করছে, তাদের জন্য নতুন মূল্য প্রযোজ্য হবে না। যারা বেশি ফি আদায় করে, তারা এর আওতায় পড়বে।
পরীক্ষাগুলো ও নির্ধারিত মূল্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়— রক্তের সিবিসি পরীক্ষার মূল্য সরকার নির্ধারণ করেছে ৫০০ টাকা। বর্তমানে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে এ পরীক্ষা করাতে ব্যয় হয় ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা।
সিআরপি পরীক্ষার মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৬০০ টাকা। হাসপাতাল ভেদে এজন্য ব্যয় হয় ৬০০ থেকে ৯০০ টাকা। এলএফটির মূল্য নির্ধারিত ১০০০ টাকা। হাসপাতাল ভেদে এ পরীক্ষায় ব্যয় হয় ৯৫০ টাকা থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা, সিরাম ক্রিটিনিন-এর সরকার নির্ধারিত মূল্য ৪০০ টাকা। এ পরীক্ষা করাতে হাসপাতাল ভেদে ব্যয় হয় ৩০০ থেকে ৬৫০ টাকা। সিরাম ইলেকটোলাইট পরীক্ষা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার টাকা। বিভিন্ন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিকে এ পরীক্ষা করাতে ব্যয় হয় ৮৫০ থেকে ১৪৫০ টাকা।
ডি-ডাইমার পরীক্ষার মূল্য নির্ধারণ হয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা। প্রতিষ্ঠান ভেদে এতে ব্যয় হয় ১ হাজার ১০০ থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা। এস ফেরেটিনিনের পরীক্ষা মূল্য নির্ধারিত হয়েছে ১ হাজার ২০০ টাকা। আগে প্রতিষ্ঠান ভেদে এর জন্য ব্যয় হতো ১ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা। এস প্রকালসাইটোনিন পরীক্ষার জন্য মূল্য নির্ধারণ হয়েছে ২ হাজার টাকা। আগে এর জন্য ব্যয় করতে হতো ১ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা। চেস্ট সিটি স্ক্যানের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ হাজার টাকা। প্রতিষ্ঠান ভেদে এ পরীক্ষায় রোগীদের ব্যয় করতে হয় ৫ হাজার থেকে ১৩ হাজার টাকা। চেস্ট এক্স-রে (অ্যানালগ)-এর মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০০ টাকা এবং ডিজিটালের ক্ষেত্রে ৬০০ টাকা। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এ পরীক্ষার ব্যয় হচ্ছে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং ডিজিটাল ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা।
তবে সরকারি হাসপাতালগুলোতে এসব পরীক্ষার ব্যয় অনেক কম বলে জানা গেছে। আবার বেশকিছু পরীক্ষার মূল্য বেশিরভাগ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত সেবা মূল্যের চেয়ে বেশি ধরা হয়েছে। জানা গেছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে সিবিসি করাতে ব্যয় হয় ১৫০ টাকা, সিরাম ক্রিটিনিন-এর মূল্য ৫০ টাকা এবং এস ইলেকটোলাইটের মূল্য ২৫০ টাকা। এছাড়া চেস্ট এক্স-রে অ্যানালগ ও ডিজিটাল যথাক্রমে ২০০ ও ৩০০ টাকা এবং চেস্ট সিটি স্ক্যান-এর মূল্য ২০০০ টাকা।
আবার বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানের অবস্থান এবং অবকাঠামোগত কারণেও বিভিন্ন চার্জ কমবেশি হয়ে থাকে। যেমন– ধানমন্ডি এলাকায় একটি প্রতিষ্ঠানের ভাড়া কিংবা জমির মূল্য মিরপুর এলাকার চেয়ে বেশি। একইভাবে সাভারের ভাড়া কিংবা জমির মূল্য মিরপুরের চেয়ে কম। তাই লোকেশনের ওপর নির্ভর করেও অনেক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন পরীক্ষার মূল্য নির্ধারণ করে। যেমন- পপুলার ডায়াগনস্টিকের একটি পরীক্ষা ধানমন্ডি শাখায় ৪০০ টাকা নেওয়া হলে, সাভারের আউটলেটে সেটি ১০০ টাকা, কিংবা ৫০ টাকা কম রাখা হয় বলে জানান সেখানকার একজন কর্মকর্তা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চিকিৎসক বলেন, রোগীর নমুনা পরীক্ষা কোন মেশিন দিয়ে করছে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। কারণ মেশিনের ওপর নির্ভর করে রি-এজেন্ট কী লাগছে তা। একেক রি-এজেন্টের মূল্য একেক রকম। এছাড়া যে প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করা হবে, সেই প্রতিষ্ঠানের সেবার মান, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ভর করে পরীক্ষা থেকে আয়ের ওপর।
তিনি আরও জানান, অনেকে কম মুনাফায় বেশি টেস্ট করেন, মুনাফা কম হলেও আয় হয় ভালো। এছাড়া এই খাতে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যও আছে। তারা নির্ধারণ করে দেয়, কত রেটের নিচে পরীক্ষা করা যাবে না। তবে কত বেশি নেওয়া যাবে তা নির্ধারণ করা হয় না। এছাড়া পরীক্ষার মূল্যের সঙ্গে চিকিৎসকদের একটা কমিশনের বিষয় তো আছেই। অনেকেই মনে করেন, চিকিৎসকদের কমিশনের কারণে মূল্য বাড়ে, কিন্তু সেটা সবক্ষেত্রে প্রযোজ্য না।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন— ধরুন, আমি একজন রোগীর ব্যবস্থাপত্রে কিছু পরীক্ষা লিখে দিলাম। রোগী কিন্তু তার পছন্দ অনুযায়ী জায়গায় পরীক্ষা করতে গেলেন। সেখানে যদি আমার নামে খাতা খোলা না থাকে, তাহলে সেই কমিশন চলে যাবে সেই প্রতিষ্ঠানের খাতায়।
রাজধানীর কাজিপাড়ার বাসিন্দা রিদওয়ানুল হক তার অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, টেস্টের ফি নিয়ন্ত্রণ করা উচিত সরকারের। বিভিন্ন পরীক্ষা করাতে গিয়ে অনেক টাকা চলে যায়। আবার পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তারকেও ফি দিতে হয়, রেজাল্ট দেখাতে। সবদিক দিয়েই আমাদের পকেট কাটা যায়।
বিগত সরকারের মেয়াদে দায়িত্ব নিয়ে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন বলেছিলেন, স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইনের মাধ্যমে দেশের সব বেসরকারি হাসপাতালে রোগ নির্ণয় পরীক্ষার ফি নির্ধারণ করা হবে। তবে এই ঘোষণা আগের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক দিলেও তা কার্যত আশার মুখ দেখেনি।
স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন (২০২৩) -এর খসড়াতে বলা হয়েছে, সরকার সময়ে সময়ে গেজেট প্রজ্ঞাপন দিয়ে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল প্রদত্ত সেবা, চিকিৎসকের ফি এবং রোগ পরীক্ষা-নিরীক্ষার চার্জ বা মূল্য বা ফি পৃথকভাবে নির্ধারণ করবে, যা ১৯৮২ সালের অধ্যাদেশে ছিল না।
স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, খসড়া আইনের কয়েকটি ধারা সংশোধনের বিষয়ে কাজ চলছে। আইন নিয়ে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের মতামত নেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকদের ফি নির্ধারণ করে দেওয়া নিয়ে এবং চিকিৎসকদের সুরক্ষা বিষয়ে কিছু মতামত এসেছিল, সেগুলো যাচাই বাছাই করে দেখা হচ্ছে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

রোগ নির্ণয় পরীক্ষার ফি নিয়ন্ত্রণ হবে কবে?
- আপলোড সময় : ২৫-০৮-২০২৪ ০১:১৮:৩২ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৫-০৮-২০২৪ ০১:১৮:৩২ অপরাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ